শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সোনাডাঙ্গার জঙ্গলে

আহমদ মতিউর রহমান

আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে রাতের আঁধারে চার কিশোরকে নিয়ে ছুটে চলেছে একটি মাইক্রোবাস। চালক বিহীন। এটা ভাবা যায়? অথচ ওদের চারজনের সামনে সেটা বাস্তব। 

পাঁচ মিনিট পর আবার ড্রাইভারকে দেখা গেল। পাশের লোকটি এখন আর নেই। অথচ গাড়ি এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি কোথাও। 

স্টিয়ারিং-এ চাদর মুড়ি দেয়া সেই লোকটি। আপন মনে মাইক্রো চালাচ্ছে। হঠাৎ ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে একটু গম্ভীর গলায় সবাইকে জানিয়ে দিল চালক- সোনাডাঙ্গা এসে গেছি। আপনারা গোছগাছ করে নেমে পড়ুন। 

আর ও দিকে গেলেই ইজিবাইক পেয়ে যাবেন। কোন দিকের কথা বললো কারো বোঝার সাধ্য নেই। 

এই বলেই পেছন দিকে চাইলো একবার। চাদরে ঢাকা নাক মুখ। কিছুই দেখা গেল না। শিপন খেয়াল করলো তার মুখটা একটা গহব্বর মাত্র। চোখদুটো লাল। যেন আগুনের গোলা। আর কেউ এটা খেয়াল করেছে কিনা কে জানে। তবে ভয়ে সে চুপ করে নেমে পড়লো। 

ঘড়ি তো স্বরাজ ছাড়া কারো হাতেই নেই। স্বরাজের ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চাতাল মতো একটা স্থানে নেমে চারজন মাইক্রোর ভাড়া মেটাবার জন্য প্রস্তুত হয়। মাইক্রোটি যেখানে থামানো হয়েছিল এখন সেখানে নেই। তার চেয়ে বেশ দক্ষিণে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা এগিয়ে গেল ড্রাইভারকে ডেকে ভাড়া মিটিয়ে দেয়ার জন্য। 

একি! ততক্ষণে মাইক্রো চলতে শুরু করেছে। 

: একি আশ্চর্যরে বাবা! রৌদ্র দেখ, গাড়ির ড্রাইভার ভাড়া না নিয়েই চলে যাচ্ছে। 

: আরে তাই তো! ওই তো চলে যাচ্ছে। আমার মনে হয় আজিম দিয়ে দিয়েছে। বললো শিপন। 

আজিম যা বললো তা শুনে সবাই তাজ্জব। 

আজিম ভাড়া দিতে চেয়েছিল। লোকটা জবাবে বলেছে

: আপনারা সবাই ছোট মানুষ। কী হবে ভাড়া নিয়ে। থাক লাগবে না। আর একটা কথা। সোনাডাঙ্গা এলাকাটা বেশি ভালো না। এমনিতেই জঙ্গুলে। তারপর ইয়ে টিয়ে আছে আরকি। ইঙ্গিতে বললাম, আমার কথা বুঝতে পেরেছেন তো? 

এ কথায় আজিম ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায়। 

লোকটা আবার বলতে শুরু করে। এখন আর সিলেটি ভাষা বলছে না। তাদের মতোই কথা বলছে। তবে গলাটা একটু ফ্যাসফ্যাসে । 

: ও দিকটায় গেলেই মাধবের ইজিবাইক পাবেন। সাবধানে যাবেন। আরো সাড়ে চার কিলো পথ গেলে তবে সিলেট। এখানে বেশিক্ষণ থাকবেন না। কোন বিপদ দেখলে আল্লাহর নাম নিয়ে লাঠি দিয়ে চারপাশে গোল দাগ দিয়ে দাগের ভেতরে বসে থাকবেন। তাহলে কোন ভয় নেই। ভেতরে বসে সুরা কেরাত পড়বেন। খবরদার দাগের বাইরে গেলেই বিপদ। 

: এই অন্ধকারে লাঠি পাব কই? বলার চেষ্টা করে আজিম। 

: লাঠি না পেলে সুরা পড়ে পা দিয়ে দাগ দিলেও হবে। গোল দাগ কিন্তু দেয়া চাই। 

তারপর সত্যি সত্যি মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল মাইক্রোবাস। 

গাড়িটা চলে যাওয়ার পর আজিম আশপাশে তালাশ করেই পেয়ে গেল একটি ছোট গাছের ডাল। এতেই হবে। বাকি তিন জনকে ডেকে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে করতে গোল দাগ দিয়ে মাঝখানে ঘাসের উপরই বসে পড়ে আজিম। 

: তাই বলে একেবারে বিনে পয়সায় পঁয়তাল্লিশ কিলো রাস্তা। মস্ত পরোপকারী বলতে হবে। 

: পরোপকারী কী বলছিস। বল সোনাডাঙ্গার পরোপকারী ভূত। বললো শিপন। সে ভূতটার আসল চেহারার কথা প্রকাশ করতে থমকে যায় সবাই। পুরো মুখ একটা গহ্বর আর মাঝখানে দুটো লাল চোখ জ্বলছে! 

সোনাডাঙ্গার জঙ্গলে এখন কোন্ রহস্য আর এ্যাডভেঞ্চার ওদের জন্য অপেক্ষা করছে কে জানে। 

(চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ